সুস্বাস্থ্য.কম

সুস্থ্য দেহ ও সতেজ মনের জন্য...

  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size

স্পাইনা বাইফিডা (Spina Bifida)

E-mail Print

এই ভূপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুদের বিশাল একটি অংশ নানাবিধ জন্মগত ত্রুটি (congenital malformation) নিয়ে জন্মায়। সেসবের মধ্যে সংখাধিক্যে সর্বাধিক ত্রুটিটির নাম স্পাইনা বাইফিডা (spina bifida)। বিশ্বে জন্ম নেয়া প্রতি ১০০০ শিশুর মাঝে ১ থেকে ২ টি শিশু এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে।

জন্মগত এই ত্রুটিটি নিউরাল টিউব (neural tube) নামক একটি ভ্রুনাংগের ত্রুটির কারনে হয়। এতে জন্ম নেয়া শিশুটির কশেরুকা (vertebra) নামক হাড়টির পেছনের অংশটি জোড়া লাগা অসম্পূর্ণ থাকে এবং এর ফলে মেরুদন্ডের অভ্যন্তরিস্থ স্পাইনাল কর্ড (spinal cord) এবং এর থেকে বের হয়ে আসা নার্ভ (nerve) গুলো অরক্ষিত হয়ে পড়ে ।

স্পাইনা বাইফিডার তিনটি প্রকারভেদ আছে - যেটি সর্বাধিক ব্যাপক এবং ক্ষতিকর তার নাম মায়েলোমেনিংগোসিল (Myelomeningocoele)। এমনটি হলে কশেরুকার পিছনের হাড়ের জোড়া লাগার অসম্পূর্নতার কারনে তার ভেতর দিয়ে মেরুরজ্জু বা spinal cord তার বিভিন্ন আবরণ এবং স্নায়ু (nerve) সহ শরীরের পিছন দিক দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসে। কোমড় বা এর ও নিম্নদেশ (Lumber & Sacral region)দিয়ে বের হয়ে আসার হারই সবচেয়ে বেশী। আর এমনটি হলে জন্ম নেয়া শিশুটি অপরিসীম ভোগান্তি নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়।তার নিম্নাংগ গুলো অবশ থাকে এমনকি মাঝে মাঝে নিতম্ব, উরু, পা এসব অঙ্গ পুরোপুরি অগঠিত থাকে। শিশুটির পায়খানা প্রসাব করার পথ সহ নিম্নাংগের এমন ত্রুটিপূর্ন গঠন তাকে এবং তার অভিভাবক কে দুর্বিসহ যাতনার মধ্যে ফেলে।

মেনিংগোসিল (Meningocoele) নামক প্রকারভেদটির হার এর চেয়ে কম। এতে কশেরুকার পিছনের ফাকটিও এতো বড় থাকেনা যে তা দিয়ে spinal cord বের হয়ে আসতে পারে। ফলে এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মনেয়া শিশুটির পিছনের দিকে সামান্য অংশ ফাকা ও ফুলে থাকা ছাড়া অন্য কোন সমস্যা থাকেনা বললেই চলে।

স্পাইনা বাইফিডা অকাল্টা (spina bifida occulta) প্রকারভেদটি সর্বাপেক্ষা কম ক্ষতিকর একটি ত্রুটি। এতে কশেরুকার পিছনের ফাকা অংশটি এতটাই ক্ষুদ্র থাকে যে তা দিয়ে spinal cord এর কোন কিছু বের হয়ে আসেনা। সামান্য ফাকা থাকা কশেরুকার পেছনের অংশটুকু ঢাকা থাকে সুন্দর ও সুগঠিত ত্বক (skin) দিয়ে। যার ফলে বাইরে থেকে বোঝার কোন উপায়ই থাকেনা যে শিশুটির এমন কোন ত্রুটি আছে। শতকরা ১০ জন শিশুই এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহন করতে পারে। ত্রুটিপূর্ন অংশের ত্বকে অস্বাভাবিক চুল জন্মানো বা জন্মদাগ থাকার কারনে এই ত্রুটিটি কারো দৃষ্টিগোচর হলেও হতে পারে।

গর্ভবতী মাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম (ultrasonogram) পরীক্ষাটি করালে অনেক সময়ই বোঝা যায় গর্ভের সন্তানটির অমন ত্রুটি আছে কিনা। তাই সন্দেহ হলে তা নিশ্চিত করতে মায়ের রক্ত পরীক্ষা করে বা এমনিওসেন্টেসিস (amniocentesis) পরীক্ষা করে দেখতে হয়। শিশুর স্পাইনা বাইফিডা বা নিউরাল টিউব এর ত্রুটি থাকলে মায়ের রক্তে আলফা ফেটো প্রোটিন (AFP=Alpha feto protein)নামক একটি উপাদান অনেক পরিমানে বেড়ে যায়।

একবার এই ত্রুটি নিয়ে কোন শিশু জন্মালে তা পুরোপুরি সারিয়ে তোলার কোন চিকিৎসা এখনো আবিস্কৃত হয়নি।তবে সমস্যা যেন আরো বৃদ্ধি না পায় এজন্য শিশু নিউরোসার্জন (pediatric neurosurgeon) শুরুতেই কশেরুকার ত্রুটিটি অপারেশনের মাধ্যমে সারিয়ে তোলেন।

স্পাইনা বাইফিডার শিশুটির ছোট খাটো অনেক স্নায়বিক/মানসিক সমস্যাও থাকতে পারে। যেমন এই ধরনের শিশুরা বড় হলে তাদের নির্বাহী ক্ষমতায় (executive power)পারদর্শীতা কম থাকে, তেমনি গণিত (mathematics) এবং পঠনেও (reading comprehension) এরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল থাকে। বন্ধু তৈরী, সামাজিক সম্পর্ক গঠন বা সামাজিক অনুষ্ঠান গুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহনে ও এরা কিছুটা অপটু থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে। ইদানিং গর্ভাবস্থায় কোন শিশুর স্পাইনা বাইফিডা রোগ ধরা পরলে মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়েই তাকে সার্জারী করে সম্পূর্ণ সুস্থ্য ভাবে জন্মদান করানো সম্ভব। অপারেশনের প্রক্রিয়াগুলো কিছুটা জটিল এবং ব্যয়বহুল, সেই সাথে এর সাফল্যের হার ও শতকরা ১০০ ভাগ নয় বলেই এই পৃথিবীকে হয়তো আরো কিছু সময় অপেক্ষা করে থাকতে হবে সম্পুর্ণ স্পাইনা বাইফিডা মুক্ত শিশু বিশ্বের জন্য।

আশার কথা হলো এই রোগটি প্রতিরোধ করার মত একটি রোগ। গর্ভধারনের শুরু থেকেই মায়েরা যদি নিয়মিত ভিটামিন ফলিক এসিড/ফলেট (folic acid/folate vitamin B9)গ্রহন করে তবে এই রোগটি হবার সম্ভাবনা খুবই কমে আসে। বাজারে ফলিক এসিড যে কোন অসুধের দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। তাছাড়া শাক সবজি (leafy vegetables), বিভিন্ন ধরনের ফল (কলা, আনারস, টমেটো, আঙ্গুর ইত্যাদি) এসবেও প্রচুর ফলিক এসিড রয়েছে। তাই স্পাইনা বাইফিডা যতো জটিল রোগই হোকনা কেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটা ইচ্ছা করলেই আপনি দমিয়ে রাখতে পারেন।

 

সুস্বাস্থ্য সুপারিশ করুন

এই সাইটের সকল তথ্য শুধুমাত্র চিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞানার্জন ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকাশিত যা কোন অবস্থাতেই চিকিৎসকের বিকল্প নয়রোগ নির্নয় ও তার চিকিৎসার জন্য সংশ্লিস্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া বাঞ্ছনীয়